আপনি জানেন কি ডায়াবেটিস কী এবং কেন হয়? এই সিক্রেট বিষয়টি কেউ জানে না
অনেক সময় শুরুতে খুব স্পষ্ট কোনো লক্ষণ তৈরি করে না। বিশেষ করে টাইপ-২ ডায়াবেটিস ধীরে ধীরে তৈরি হতে পারে এবং এর লক্ষণ এতটাই হালকা হতে পারে যে অনেক মানুষ সেগুলোকে সাধারণ ক্লান্তি, বেশি পানি খাওয়ার অভ্যাস বা বয়সজনিত পরিবর্তন বলে মনে করেন। ফলে রোগটি শনাক্ত হতে অনেক সময় দেরি হয়ে যায়।
তবে শরীরে কিছু পরিবর্তন দেখা দিলে সেগুলোকে একেবারে অবহেলা না করাই ভালো। বারবার প্রস্রাব হওয়া, অস্বাভাবিক তৃষ্ণা, অতিরিক্ত ক্ষুধা, কারণ ছাড়াই ওজন কমে যাওয়া, অতিরিক্ত ক্লান্তি, ঝাপসা দেখা কিংবা ক্ষত শুকাতে দেরি হওয়ার মতো লক্ষণ ডায়াবেটিসের প্রাথমিক লক্ষণ হতে পারে। তবে এসব লক্ষণ অন্য কারণেও হতে পারে। তাই শুধু লক্ষণ দেখে ডায়াবেটিস নিশ্চিত করা যায় না; প্রয়োজন হলে রক্তের পরীক্ষা করতে হয়।
ডায়াবেটিস কী এবং কেন হয়?
ডায়াবেটিস হলো এমন একটি দীর্ঘমেয়াদি রোগ, যেখানে রক্তে গ্লুকোজ বা শর্করার মাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি থাকে। আমাদের শরীর খাবার থেকে গ্লুকোজ পায় এবং ইনসুলিন নামের একটি হরমোন সেই গ্লুকোজকে শরীরের কোষে শক্তি হিসেবে ব্যবহারের জন্য সাহায্য করে। টাইপ-২ ডায়াবেটিসে শরীর ইনসুলিন ঠিকমতো ব্যবহার করতে না পারা বা প্রয়োজনের তুলনায় কম ইনসুলিন তৈরি করার কারণে রক্তে শর্করা বেড়ে যেতে পারে।

ডায়াবেটিসের ধরনভেদে লক্ষণের প্রকাশও আলাদা হতে পারে। টাইপ-১ ডায়াবেটিসের লক্ষণ অনেক সময় কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই দ্রুত প্রকাশ পেতে পারে। অন্যদিকে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের লক্ষণ অনেক ধীরে তৈরি হতে পারে এবং কারও কারও ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় কোনো লক্ষণই চোখে পড়ে না।
এই কারণেই ডায়াবেটিসের প্রথম লক্ষণ সম্পর্কে ধারণা থাকা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ লক্ষণ সম্পর্কে সচেতন হলে প্রয়োজনের সময় পরীক্ষা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হয়।
ডায়াবেটিসের প্রাথমিক লক্ষণগুলো কী?
সব মানুষের ক্ষেত্রে ডায়াবেটিসের লক্ষণ একই রকম হয় না। কারও একটি বা দুটি লক্ষণ দেখা দিতে পারে, আবার কারও একাধিক পরিবর্তন একসঙ্গে দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রে লক্ষণ ধীরে ধীরে তৈরি হতে পারে। নিচে ডায়াবেটিস হওয়ার লক্ষণ হিসেবে দেখা যেতে পারে এমন গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনগুলো সহজভাবে ব্যাখ্যা করা হলো।
১) বারবার প্রস্রাব হওয়া
বারবার প্রস্রাব হওয়া ডায়াবেটিসের প্রাথমিক লক্ষণগুলোর মধ্যে অন্যতম। রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে গেলে শরীর অতিরিক্ত গ্লুকোজ প্রস্রাবের মাধ্যমে বের করার চেষ্টা করে। এর ফলে প্রস্রাবের পরিমাণ ও ঘনত্ব বেড়ে যেতে পারে এবং স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি বার প্রস্রাবের প্রয়োজন হতে পারে।
আরও পড়ুন : আদা খাওয়ার উপকারিতা ও সঠিক নিয়ম: কখন, কতটুকু এবং কীভাবে খাবেন
বিশেষ করে রাতে বারবার ঘুম ভেঙে প্রস্রাব করতে হলে বিষয়টি খেয়াল করা প্রয়োজন। অবশ্য বেশি পানি পান করা, মূত্রনালির সংক্রমণ, কিছু ওষুধ কিংবা অন্যান্য শারীরিক কারণেও ঘন ঘন প্রস্রাব হতে পারে। তাই শুধু এই একটি লক্ষণ দেখেই ডায়াবেটিস ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
২) অতিরিক্ত তৃষ্ণা পাওয়া
বারবার প্রস্রাবের কারণে শরীর থেকে বেশি তরল বের হয়ে যেতে পারে। ফলে অনেকের অস্বাভাবিক তৃষ্ণা অনুভূত হতে পারে এবং স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি পানি পান করার প্রয়োজন হতে পারে। অতিরিক্ত তৃষ্ণা এবং ঘন ঘন প্রস্রাব একসঙ্গে দেখা দিলে রক্তে শর্করা পরীক্ষা করার বিষয়টি চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করা যেতে পারে। তবে গরম আবহাওয়া, বেশি ঘাম, বেশি লবণ খাওয়া বা শরীরে পানিশূন্যতার কারণেও তৃষ্ণা বাড়তে পারে।
৩) স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি ক্ষুধা লাগা
ডায়াবেটিসের আরেকটি সম্ভাব্য লক্ষণ হলো স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি ক্ষুধা লাগা। রক্তে গ্লুকোজ থাকলেও ইনসুলিনের সমস্যা বা ইনসুলিন ঠিকমতো কাজ না করার কারণে শরীরের কোষ সেই গ্লুকোজ যথাযথভাবে ব্যবহার করতে না পারলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। কেউ কেউ খাবার খাওয়ার পরও দ্রুত ক্ষুধার্ত অনুভব করতে পারেন। তবে বেশি ক্ষুধা লাগার আরও অনেক কারণ থাকতে পারে। তাই এটিকেও এককভাবে ডায়াবেটিসের প্রমাণ হিসেবে দেখা যাবে না।
৪) কারণ ছাড়াই ওজন কমে যাওয়া
খাবারের পরিমাণ বা শারীরিক পরিশ্রমে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন না থাকলেও যদি অকারণে ওজন কমতে থাকে, বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। বিশেষ করে টাইপ-১ ডায়াবেটিসে অস্বাভাবিক ওজন কমে যাওয়ার সঙ্গে অতিরিক্ত তৃষ্ণা, বারবার প্রস্রাব ও ক্ষুধা বাড়ার মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে। অবশ্য ওজন কমার পেছনে থাইরয়েডের সমস্যা, হজমের সমস্যা, দীর্ঘস্থায়ী সংক্রমণসহ আরও অনেক কারণ থাকতে পারে। তাই কারণ না জেনে শুধু ডায়াবেটিস ধরে নেওয়া উচিত নয়।
৫) অস্বাভাবিক ক্লান্তি বা দুর্বলতা
পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়ার পরও যদি নিয়মিত অস্বাভাবিক ক্লান্তি বা দুর্বলতা অনুভূত হয়, সেটিও ডায়াবেটিসের লক্ষণ হতে পারে। রক্তে শর্করা বেড়ে গেলে শরীরের কোষ গ্লুকোজকে স্বাভাবিকভাবে শক্তি হিসেবে ব্যবহার করতে না পারায় ক্লান্তি অনুভূত হতে পারে। তবে ঘুমের অভাব, মানসিক চাপ, রক্তস্বল্পতা, অপুষ্টি, থাইরয়েডের সমস্যা এবং আরও অনেক কারণেও ক্লান্তি হতে পারে।
৬) চোখে ঝাপসা দেখা
হঠাৎ বা বারবার চোখে ঝাপসা দেখা রক্তে শর্করা বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। রক্তে গ্লুকোজের মাত্রার পরিবর্তনের কারণে চোখের ভেতরের তরলের ভারসাম্যে প্রভাব পড়তে পারে এবং সাময়িকভাবে দৃষ্টিতে ঝাপসাভাব তৈরি হতে পারে। তবে ঝাপসা দেখার আরও অনেক কারণ রয়েছে। তাই নতুন করে দৃষ্টির সমস্যা শুরু হলে চোখের চিকিৎসক বা চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
৭) ক্ষত বা কাটা জায়গা শুকাতে দেরি হওয়া
কাটা, ঘা বা ক্ষত স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় ধীরে শুকানোও ডায়াবেটিসের প্রাথমিক লক্ষণ হতে পারে। বিশেষ করে দীর্ঘদিন রক্তে শর্করা বেশি থাকলে ক্ষত সারতে সমস্যা হতে পারে। পায়ে ছোট ক্ষত হলেও তা অবহেলা করা উচিত নয়। কারণ ডায়াবেটিস থাকলে পায়ের সমস্যা গুরুতর হওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
৮) বারবার সংক্রমণ হওয়া
বারবার মূত্রনালির সংক্রমণ, ত্বকের সংক্রমণ বা কিছু ধরনের ছত্রাকজনিত সংক্রমণ ডায়াবেটিসের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। তবে সংক্রমণ হলেই ডায়াবেটিস আছে—এমন নয়। কিন্তু বারবার একই ধরনের সংক্রমণ হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করা যেতে পারে।
৯) হাত-পায়ে ঝিনঝিনি বা অবশভাব
হাত বা পায়ে ঝিনঝিনি, অসাড়তা বা অনুভূতি কমে যাওয়ার মতো সমস্যা ডায়াবেটিসের সঙ্গে দেখা দিতে পারে, বিশেষ করে রোগ দীর্ঘদিন থাকলে। টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রে কেউ কেউ রোগ শনাক্ত হওয়ার সময়ই এ ধরনের সমস্যার কথা জানান। তবে স্নায়ুর চাপ, ভিটামিনের ঘাটতি, মেরুদণ্ডের সমস্যা বা অন্য কারণেও হাত-পায়ে ঝিনঝিনি হতে পারে।
১০) ত্বকে কিছু অস্বাভাবিক পরিবর্তন
বিশেষ করে ঘাড়, বগল বা কুঁচকির আশপাশে কালচে ও মোটা ধরনের ত্বকের দাগ দেখা দিলে তা ইনসুলিন প্রতিরোধের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। এ ধরনের পরিবর্তনকে অবহেলা না করে প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো। তবে ত্বকের কালচে দাগেরও বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে।
আরও পড়ুন : সকালে খালি পেটে পানি পান করার উপকারিতা ও সতর্কতা
শুধু লক্ষণ দেখে কি ডায়াবেটিস নিশ্চিত করা যায়?
না। এটি খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। ডায়াবেটিসের প্রাথমিক লক্ষণ থাকলেই একজন ব্যক্তির ডায়াবেটিস হয়েছে—এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। একই ধরনের লক্ষণ অন্য অনেক রোগ বা শারীরিক অবস্থার কারণেও হতে পারে। আবার টাইপ-২ ডায়াবেটিসে অনেক মানুষের কোনো লক্ষণই থাকে না। তাই শুধু নিজের অনুভূতি বা লক্ষণের ওপর নির্ভর না করে প্রয়োজন হলে রক্তের পরীক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে পরিবারের কারও ডায়াবেটিস থাকলে, অতিরিক্ত ওজন থাকলে, শারীরিক পরিশ্রম কম হলে বা অন্য ঝুঁকির কারণ থাকলে চিকিৎসকের সঙ্গে ডায়াবেটিস পরীক্ষার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে।
ডায়াবেটিসের প্রাথমিক লক্ষণ থাকলে কী পরীক্ষা করা হয়?
ডায়াবেটিস শনাক্ত করার জন্য রক্তের বিভিন্ন পরীক্ষা ব্যবহার করা হয়। এর মধ্যে এ১সি (HbA1c), উপবাস অবস্থায় রক্তের শর্করা পরীক্ষা, নির্দিষ্ট সময় পর গ্লুকোজ সহনশীলতা পরীক্ষা এবং কিছু ক্ষেত্রে যেকোনো সময়ের রক্তের শর্করা পরীক্ষা ব্যবহার করা হয়। এ১সি পরীক্ষার একটি সুবিধা হলো এর জন্য পরীক্ষার আগে দীর্ঘ সময় উপবাস থাকা প্রয়োজন হয় না। এই পরীক্ষায় সাম্প্রতিক কয়েক মাসের গড় রক্তে শর্করার একটি ধারণা পাওয়া যায়। তবে কোন পরীক্ষা প্রয়োজন এবং ফলাফল কীভাবে ব্যাখ্যা করতে হবে, তা ব্যক্তির অবস্থা অনুযায়ী চিকিৎসক নির্ধারণ করতে পারেন।
বাড়িতে গ্লুকোমিটার দিয়ে পরীক্ষা করলেই কি ডায়াবেটিস ধরা পড়ে?
বাড়িতে গ্লুকোমিটার দিয়ে রক্তে শর্করা মাপা দৈনন্দিন পর্যবেক্ষণের জন্য কাজে লাগতে পারে। কিন্তু শুধু বাড়ির গ্লুকোমিটারের একটি ফলাফল দেখে নিজে নিজে ডায়াবেটিসের চূড়ান্ত রোগ নির্ণয় করা উচিত নয়।ডায়াবেটিস নির্ণয়ের জন্য নির্দিষ্ট রক্ত পরীক্ষা এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানের নির্ধারিত মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়। তাই গ্লুকোমিটারে অস্বাভাবিক ফল পেলে আতঙ্কিত না হয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করা ভালো।
কারা ডায়াবেটিসের ঝুঁকিতে বেশি?
সব মানুষের ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি এক নয়। টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রে বয়স বাড়া, অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতা, পরিবারের সদস্যের ডায়াবেটিস থাকা, শারীরিকভাবে কম সক্রিয় থাকা এবং আগে প্রিডায়াবেটিস থাকা—এসব বিষয় ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিসের ইতিহাস থাকলেও পরবর্তী সময়ে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
তবে ঝুঁকির কারণ থাকলেই যে ডায়াবেটিস হবেই, এমন নয়। একইভাবে কোনো ঝুঁকির কারণ না থাকলেও ডায়াবেটিস হতে পারে।
প্রিডায়াবেটিস থাকলে কি কোনো লক্ষণ দেখা যায়?
প্রিডায়াবেটিস হলো এমন একটি অবস্থা, যেখানে রক্তে শর্করার মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি হলেও তা ডায়াবেটিস নির্ণয়ের সীমায় পৌঁছায় না।
প্রিডায়াবেটিসে অনেক সময় কোনো স্পষ্ট লক্ষণ থাকে না। এই কারণে শুধু শরীরে কোনো পরিবর্তন হচ্ছে কি না, তা দেখে প্রিডায়াবেটিস শনাক্ত করা কঠিন। রক্তের পরীক্ষা করেই এটি শনাক্ত করা যায়।
এ কারণে যাদের ঝুঁকি বেশি, তাদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পরীক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ।
কখন ডায়াবেটিস পরীক্ষা করা উচিত?
শরীরে ডায়াবেটিসের লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলে পরীক্ষা করার বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত। বিশেষ করে অতিরিক্ত তৃষ্ণা, বারবার প্রস্রাব, কারণ ছাড়া ওজন কমে যাওয়া, ঝাপসা দেখা এবং দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তির মতো একাধিক লক্ষণ একসঙ্গে থাকলে বিষয়টি অবহেলা করা ঠিক নয়।
আবার কোনো লক্ষণ না থাকলেও যাদের টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি রয়েছে, তাদেরও চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত পরীক্ষা প্রয়োজন হতে পারে। কারণ টাইপ-২ ডায়াবেটিস অনেক সময় নীরবে এগোয়।
ডায়াবেটিসের লক্ষণ দেখা দিলে কী করবেন?
প্রথমেই আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। কারণ উপরে উল্লেখ করা প্রায় সব লক্ষণেরই ডায়াবেটিস ছাড়া অন্য কারণ থাকতে পারে।
তবে একই সঙ্গে একাধিক লক্ষণ দেখা দিলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত।
১) নিজের লক্ষণগুলো কখন থেকে শুরু হয়েছে এবং কত ঘন ঘন হচ্ছে, তা খেয়াল করুন।
২) চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে প্রয়োজনীয় রক্ত পরীক্ষা করুন।
৩) অতিরিক্ত মিষ্টি পানীয় ও অস্বাস্থ্যকর খাবার কমিয়ে সুষম খাবারের দিকে মনোযোগ দিন।
৪) নিয়মিত শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকার অভ্যাস করুন, যদি আপনার শারীরিক অবস্থা তার অনুমতি দেয়।
৫) পরীক্ষায় রক্তে শর্করা বেশি এলে নিজের ইচ্ছায় ওষুধ শুরু বা বন্ধ না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমাতে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা সহায়ক হতে পারে।
ডায়াবেটিসের কিছু গুরুতর লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নিন
কিছু পরিস্থিতিতে অপেক্ষা না করে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে প্রচণ্ড দুর্বলতা, বমি, পেটে ব্যথা, শ্বাস নিতে কষ্ট, মুখে ফলের মতো গন্ধ, পানিশূন্যতা বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে তা গুরুতর রক্তে শর্করার সমস্যা বা ডায়াবেটিক কিটোঅ্যাসিডোসিসের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। এটি জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে।
বিশেষ করে টাইপ-১ ডায়াবেটিসে এ ধরনের সমস্যা দ্রুত তৈরি হতে পারে। তাই এমন উপসর্গকে ঘরোয়া উপায়ে সামলানোর চেষ্টা না করে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।
ডায়াবেটিসের প্রাথমিক লক্ষণ নিয়ে প্রচলিত ভুল ধারণা
অনেকে মনে করেন, খুব বেশি মিষ্টি খেলেই শুধু ডায়াবেটিস হয়। বাস্তবে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের পেছনে অতিরিক্ত ওজন, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, বংশগত কারণ, ইনসুলিন প্রতিরোধসহ একাধিক বিষয় ভূমিকা রাখতে পারে।
আবার কেউ কেউ মনে করেন, ডায়াবেটিস হলে অবশ্যই প্রচণ্ড তৃষ্ণা ও বারবার প্রস্রাব হবে। এটিও সঠিক নয়। বিশেষ করে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রে লক্ষণ খুব মৃদু হতে পারে অথবা কোনো লক্ষণ নাও থাকতে পারে।
আরেকটি ভুল ধারণা হলো, শরীরে কোনো লক্ষণ না থাকলে ডায়াবেটিস নেই। বাস্তবে প্রিডায়াবেটিস ও টাইপ-২ ডায়াবেটিস অনেক সময় লক্ষণ ছাড়াই থাকতে পারে। তাই ঝুঁকি থাকলে প্রয়োজন অনুযায়ী পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ।
ডায়াবেটিসের প্রাথমিক লক্ষণ সম্পর্কে সাধারণ প্রশ্ন
ডায়াবেটিসের প্রথম লক্ষণ কী?
সবার ক্ষেত্রে একই লক্ষণ দেখা যায় না। অতিরিক্ত তৃষ্ণা, বারবার প্রস্রাব, বেশি ক্ষুধা, ক্লান্তি, ঝাপসা দেখা, কারণ ছাড়া ওজন কমা এবং ক্ষত শুকাতে দেরি হওয়া—এসব ডায়াবেটিসের প্রথম লক্ষণ হিসেবে দেখা দিতে পারে।
রাতে বারবার প্রস্রাব হলে কি ডায়াবেটিস হয়েছে?
শুধু রাতে বারবার প্রস্রাব হলেই ডায়াবেটিস নিশ্চিত নয়। তবে এর সঙ্গে অতিরিক্ত তৃষ্ণা, ওজন কমা বা ক্লান্তির মতো আরও লক্ষণ থাকলে রক্তে শর্করা পরীক্ষা করার বিষয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।
ডায়াবেটিস হলে কি সবসময় তৃষ্ণা বেশি পায়?
না। অনেকের ক্ষেত্রে বিশেষ করে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের শুরুতে কোনো স্পষ্ট লক্ষণ নাও থাকতে পারে।
ডায়াবেটিসের কারণে কি ওজন কমে?
হ্যাঁ, বিশেষ করে টাইপ-১ ডায়াবেটিসে কারণ ছাড়া ওজন কমে যেতে পারে। তবে ওজন কমার আরও অনেক কারণ রয়েছে। তাই পরীক্ষা ছাড়া কারণ নিশ্চিত করা যায় না।
ডায়াবেটিস হলে কি চোখে ঝাপসা দেখা যায়?
রক্তে শর্করার মাত্রা বেশি হলে ঝাপসা দেখা দিতে পারে। তবে চোখে ঝাপসা দেখার আরও অনেক কারণ থাকতে পারে। তাই নতুন বা স্থায়ী দৃষ্টির সমস্যা হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
ডায়াবেটিসের লক্ষণ না থাকলেও কি পরীক্ষা করা দরকার?
হ্যাঁ, প্রয়োজন হতে পারে। কারণ বিশেষ করে টাইপ-২ ডায়াবেটিস ও প্রিডায়াবেটিস অনেক সময় কোনো স্পষ্ট লক্ষণ ছাড়াই থাকতে পারে। ঝুঁকির কারণ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পরীক্ষা করা যেতে পারে।
ডায়াবেটিস আছে কি না বুঝতে কোন পরীক্ষা করা হয়?
এ১সি, উপবাস অবস্থায় রক্তের শর্করা, গ্লুকোজ সহনশীলতা পরীক্ষা এবং নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে যেকোনো সময়ের রক্তের শর্করা পরীক্ষা ব্যবহার করা হয়। কোন পরীক্ষা প্রয়োজন তা চিকিৎসক নির্ধারণ করতে পারেন।
শেষ কথা
ডায়াবেটিসের প্রাথমিক লক্ষণ সম্পর্কে জানা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ রোগটি অনেক সময় ধীরে ধীরে তৈরি হয় এবং বিশেষ করে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের শুরুতে লক্ষণ খুব সামান্য হতে পারে। অতিরিক্ত তৃষ্ণা, বারবার প্রস্রাব, অস্বাভাবিক ক্ষুধা, কারণ ছাড়া ওজন কমে যাওয়া, ক্লান্তি, ঝাপসা দেখা বা ক্ষত শুকাতে দেরি হওয়ার মতো পরিবর্তন দেখা দিলে বিষয়টি অবহেলা না করাই ভালো।
তবে কোনো একটি লক্ষণ দেখে নিজে নিজে ডায়াবেটিসের সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়। ডায়াবেটিস নিশ্চিত করার জন্য রক্তের পরীক্ষা প্রয়োজন। আবার কোনো লক্ষণ না থাকলেও ঝুঁকি বেশি হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পরীক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ।
সঠিক সময়ে ডায়াবেটিস শনাক্ত করা গেলে খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক কার্যক্রম, ওজন নিয়ন্ত্রণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসার মাধ্যমে রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে রাখার সুযোগ তৈরি হয়। তাই শরীরের অস্বাভাবিক পরিবর্তনকে অবহেলা না করে প্রয়োজন হলে সময়মতো পরীক্ষা ও চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
